সময় সংবাদের কাছে জায়েদ খানের বিরুদ্ধে নানা বিষয়ে অভিযোগ করেছেন একাধিকবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত অভিনেত্রী ও শিল্পী সমিতির সাবেক নেত্রী চিত্রনায়িকা পপি। তবে সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন চিত্রনায়ক জায়েদ খান।

পপি বলেন, ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে গড়া বিএফডিসিতে এখন দলাদলি, সিনিয়র-জুনিয়র শিল্পীদের মধ্যে নেই সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক। পেশী শক্তি ব্যবহার করে চেয়ার দখল, ভোটে কারচুপি, শিল্পীদের সম্মানহানি, শিল্পীদের সঙ্গে আরেক শিল্পীর দূরত্ব তৈরি করাসহ একের পর এক স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড হচ্ছে। অযোগ্য লোকের নেতৃত্বে জিম্মি আজ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি। এসবের মূলে রয়েছেন বর্তমান সাধারণ সম্পাদক জায়েদ খান।

পপির সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে জায়েদ খান সময় সংবাদকে বলেন, সমিতির সকল কর্মকাণ্ড নিয়ম মেনেই করি। আর তিনি যে সমস্ত অভিযোগ আনছেন সেগুলো শুধুমাত্র আমাকে হেয় করার জন্য। আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের যদি প্রমাণ দিতে পারেন তাহলে সমিতির সাংগঠনিক নিয়ম অনুযায়ী যে শাস্তি হবে তাই আমি মাথা পেতে নেব।

আরও পড়ুন: মিশা-জায়েদের পদত্যাগের পরই আলোচনা, তার আগে নয়
এর আগে আক্ষেপ নিয়ে পপি বলেন, ‘আমার চলচ্চিত্রে এত বছরের ক্যারিয়ারে এমন ঘটনা কখনও দেখিনি- সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের পদত্যাগের জন্য একসাথে এতজন শিল্পী রাস্তায় নেমে মানববন্ধন করতে! এটাই আমার প্রথম। যারা রাস্তায় নেমেছেন তারা কিন্তু রাজ্জাক আঙ্কেল, আলমগীর ভাই থেকে শুরু করে এসময়ের শিল্পীদের সঙ্গে কাজ করে আসছেন। তারা কিন্তু ভোটও প্রদান করেছেন শিল্পী সমিতি নির্বাচনে। তাদের ভোটেই কিন্তু চেয়ার পেয়েছেন জায়েদ খান। কিন্তু চেয়ার পাওয়ার পর তিনি ওই শিল্পীদের সদস্যপদ বাতিল করেছেন। এর থেকে নোংরা কাজ আর কিছুই নেই। এতকিছুর পরও ওই শিল্পীরা ফিল্মকে ভালোবেসে থেকে গেছেন।’পপি-মিশা অভিনীত বহু ছবি সুপারহিট হয়েছে। চলচ্চিত্রে মিশার অবদান ভুলবার নয়। আর সমিতির সভাপতি হিসেবেও মিশাকেই যোগ্য ব্যক্তি মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

এ বিষয়ে পপি বলেন, মিশা ভাইয়ের সঙ্গে আমি অনেক ছবিতে কাজ করেছি। তিনি একজন গুণী মানুষ। তার সম্পর্কে আমার বলার কিছু নেই। তিনি অনেক ভালোমানের একজন শিল্পী।

এদিকে গেল ১৯ জুলাই ১৮৪ জন শিল্পী জায়েদ-মিশার পদত্যাগ চেয়ে রাস্তায় নামেন। এ প্রসঙ্গে পপি বলেন, জায়েদ খানের বিরুদ্ধে যে সমস্ত শিল্পীরা রাস্তায় নেমেছেন তারা কিন্তু শিল্পী, তাদের অধিকারের জন্য নেমেছেন। কেউ অন্যায়ভাবে রাস্তায় নামেনি। এই ১৮৪ জন শিল্পীর ভোটাধিকার নিজের সদস্যপদ ফিরে পেতেই কিন্তু নেমেছেন। আমরা যারা কমিটিতে ছিলাম অনেকেই এটার প্রতিবাদ করেছিলাম। কারো কথাই শোনা হয়নি। একের পর এক অনিয়মকে তারা প্রতিষ্ঠিত করেছে। কথা বলতে গেলেই হুমকি-ধামকি দেওয়া হত। এমনকি আমাকেও আমার সদস্যপদ বাতিল করার জন্য চিঠি দেওয়া হয়। রিয়াজ-ফিরদৌস, পূর্ণিমা-শাবণূরের মতো শিল্পীদেরকেও অসম্মান করতে ছাড় দেননি। এসব কারণে কিন্তু আজ চলচ্চিত্র দুভাগে বিভক্ত হয়েছে। আর এই বিভক্তের মূল কারিগর জায়েদ খান। ওই একটা লোকেই এই চলচ্চিত্র শিল্পীদেরকে নিয়ে খেলছে। সবাইকে বুঝিয়েছিলাম বিষয়টি। শিল্পীরা বোঝেননি। অনেক সিনিয়ররাও আবেগী ও কৌশলী ফাঁদে পা দিয়ে সমর্থন দিয়ে পুনরায় তাকেই ক্ষমতায় নিয়ে আসেন।পপি আরও বলেন, ‘যাদের ভোটে নির্বাচিত হলেন তাদেরকেই বাদ দিলেন তিনি। মানে বাবা-মা জন্ম দিলেন পরবর্তীতে তাকেই চিনলেন না তিনি, এমনই বিষয়টি। আর যে নিজের জন্মকে অস্বীকার করেন সে কখনোই ভালো মানুষ আর ভালো শিল্পী হতে পারেন না। শিল্পীর এমন আচরণ হতে পারে না।

জায়েদ খানের দুর্নীতির বিস্তর বর্ণনা দিতে গিয়ে পপি বলেন, আমরা অসহায় শিল্পীদের সহযোগিতা করার জন্য অনেক শো করেছি। যেখানে যেখানে শো করতে গিয়েছি সেখানে নিজেরাই গেছি। জায়েদ খান আমাদের সেখানেই নিয়ে যেত যেখানে ফান্ড কালেকশন হতো, আর যেখানে ভোট কিনতে যেতেন সেখানে নিয়ে যেতেন না। ভোট কিনতে গিয়ে সেখানে নিজের সেলফি তুলে দান করছেন, দিচ্ছেন সেই সমস্ত ছবি ফেসবুকে দিতেন। আর যদি কখনও আমরা থাকতাম ছবিতে সেই ছবি এডিট করে শুধু তার নিজের ছবি ব্যবহার করতেন। এভাবেই অনেক টাকা কালেকশন হয়েছে। সে টাকাগুলোর সঠিক হিসাব কিন্তু আমরা পাইনি। এই হিসাব চাইতে গেলেই আমাদের মিটিংয়ে আর ডাকত না।

২০১৭ সালের নির্বাচনের পর কমিটির কার্যক্রম নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠেছে, অনেক সমালোচনা হয়েছে সবাইকে নিয়ে- সময় সংবাদের এমন প্রশ্নের জবাবে পপি বলেন, এর আগে গত শিল্পী সমিতি নির্বাচনে রিয়াজ, ফেরদৌস, মিশা, নিপূণ, পূর্ণিমাসহ অনেক স্টার এক সঙ্গে জায়েদকে নিয়ে নির্বাচন করেন। সেখানে একমাত্র ফ্লপ নায়ক ছিলেন জায়েদ খান। তারপরও ভেবেছিলাম শিল্পীদের জন্য কিছু করার জন্য আমরা নীতিগতভাবে এক হয়েছি। কিন্তু নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর গভীর রাত পর্যন্ত সমিতি খোলা থাকত। বলতে গেলে নিজের আড্ডাখানা তৈরি করেছিলেন। সমিতিতে যারা আসতেন তাদের আমরা দেখা তো দূরের কথা কেউ চিনতামও না। নতুন মেয়েদের দেখা যেত। এমন কর্মকাণ্ডের কারণে বিব্রত হয়ে সরে দাঁড়িয়েছি।পপি আরো বলেন, বিগত সময়ে কখনো কোনো শিল্পীকে কেউ দেখেনি একজনের মৃত্যুর পর তার মরদেহের সঙ্গে ছবি তুলতে। জায়েদ খান কিন্তু মরদেহের সঙ্গে ছবি তোলে, আবার সেই ছবি ফেসবুকে পোস্ট করে পাবলিসিটি করে। এর মানে তিনি কিন্তু মরদেহের মাধ্যমে ব্যবসা করেন।

জায়েদ খান মরদেহের সঙ্গে ছবি তোলার বিষয়ে বলেন, আমাদের শিল্পীদের কেউ অসুস্থ আর যদি কেউ মারা যায় সেখানে শিল্পী সমিতির নেতা হিসেবে আমাকে তাদের পরিবারের সাথে থাকতে হবে। তাই আমি ছুটে যাই, আর সেখানে গিয়ে অন্য কেউ ছবি তুললে সেটাতে তো আমার করণীয় কিছু নেই।

চিত্রনায়ক ফারুক প্রসঙ্গে ‘গার্মেন্টস কন্যা’ খ্যাত অভিনেত্রী বলেন, ফারুক ভাই অত্যন্ত গুণী একজন মানুষ তাকে আমি সম্মান করি। যখন এ গ্রেডের নায়ক শাকিব খানকে বয়কট করলেন তখন আপনি ভুলে গিয়েছিলেন শিল্পীদের বয়কট করা যায় না। আর এখন বি গ্রেডের নায়কের জন্য বলছেন শিল্পীদের বয়কট করা যায় না। তার কাছে আমার প্রশ্ন শাকিবকে বয়কট তো আপনি করেছিলেন। এখন কেনও আপনার কথার সূর পরিবর্তন হলো। পপি আরো বলেন, ‘আমি যখন ফিল্ম ক্লাবের নির্বাচন করেছি তখন এফডিসি থেকে জায়েদ আমার পোস্টার ছিঁড়ে ফেলেছে এবং সরিয়ে ফেলেছে। এটা শিল্পীসুলভ আচরণ নয়। তিনি আজ পুরো ইন্ডাস্ট্রিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে দিয়েছেন। রুবেল ভাই, মান্না ভাই, রিয়াজ, ফেরদৌসদের মতো সুপারস্টারদের নায়িকা হয়ে কাজ করেছি। তখন কিন্তু এ ধরনের নোংরামি ছিল না। ’

জায়েদ খানকে সেলফি শাহেদের সাথে তুলনা করে (রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান শাহেদ করিম) পপি বলেন, তার মতো অনেক বড় বড় লোকের সাথে ছবি তুলে নিজেকে জাহির করেন। প্রভাবশালীদের সাথে ছবি তুলে তা ফেসবুকে পোস্ট করে তিনি সাধারণ শিল্পীদের ব্ল্যাকমেইল করে নিজের রাজত্ব জাহির করেন।

আপনাকে জায়েদ খান কি ব্ল্যাকমেইলের ফাঁদে ফেলছেন? এমন প্রশ্নে পপি বলেন, ‘আমার সাথে সে নিজেই করেছে। আমার সাথে সদস্যপদ খারিজ করার জন্য হুমকিও দিয়েছে। এমনকি আমার সাথে অন্য কেউ যেন কাজ না করে সেই বিষয়েও অনেককে অনেক কিছু বলেছে। আমি ফিল্ম ক্লাবে নির্বাচনে যেন পাশ না করি সে বিষয়ে অনেকরকম কর্মকাণ্ড করেছেন। জায়েদ খান আমার বয়সের সিনিয়র হলেও কিন্তু ক্যারিয়ারে অনেক জুনিয়র। আমি অনেক ব্যবসাসফল সিনেমা উপহার দিয়েছি। এই ভালোবাসার কারণে ফিল্ম ক্লাবের নির্বাচনে সর্বাধিক ভোটে জয়ী হয়।

তবে সদস্যপদ বাতিল প্রসঙ্গে জায়েদ খান বলেন, সদস্যপদ বাতিল করার আমি কেউ না। আর কোনো সদস্যকে বাতিল করতে হলে সাংগঠনিক নিয়ম ফলো করতে হয়। সেখানে কমিটির সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আমি একা কিছু করার কেউ না। তাছাড়া পপিকে এধরনের কোনো নোটিশ দেওয়া হয়নি। অসম্মান করার উদ্দেশ্যে আমাকে তিনি এসব হয়ত বুঝে নয়ত না বুঝেই করছেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here