দীর্ঘ ১০৯ বছর ধরে রাখছেন রোজা, খালি চোখে পড়েন কোরআন

রোজা এমন এক সার্বজনীন ইবাদত, যা রোজাদারকে কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ প্রভৃতি রিপু থেকে রক্ষা করে। এ রোজা একজন মানুষকে দান করে ধর্মীয় মূল্যবোধ, নীতি-নৈতিকতা, অন্তরের পবিত্রতা ও চিন্তাধারার বিশুদ্ধতা।

জীবদ্দশার ১১৬ বছরের মধ্যে ১০৯ বছর ধরেই প্রতি রমজান মাসে রোজা পালন করে আসছেন বৃদ্ধ সৈয়দ মোহাম্মদ আনছারী জান্নাতুল ফেরদৌস। ৭ বছর বয়স থেকেই তিনি রমজানের রোজা রাখছেন।

আল্লাহর দেয়া দীর্ঘ হায়াতপ্রাপ্ত এই বৃদ্ধ জীবনের ১১৬ বছর অতিবাহিত করলেও এখনও তিনি খালি চোখে কোরআন শরীফ তেলায়াত করে চলছেন। রাত ১২ টা থেকে গভীর রাতেও তিনি খালি চোখে অবিরাম কোরআন তেলাওয়াত করছেন।

শতবর্ষেরও অধিক বয়সী এই বৃদ্ধের জন্মস্থান কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার নাথের পেটুয়া বাতাসু বড়বাড়ী গ্রামে। বাবা মাওলানা আব্দুল মজিদ আনছারী ও মা ফাতেমা বেগম। ৩ বোন ৪ ভাইবোনের মধ্যে সৈয়দ মোহাম্মদ আনছারী জান্নাতুল ফেরদৌস সবার ছোট।

মা, বাবা, ভাই, বোন সবাই পৃথিবী ছেড়ে কবরবাসী হলেও জান্নাতুল ফেরদৌস আল্লাহর অশেষ রহমতে বেঁচে আছেন। তিনি বর্তমান বসবাস করছেন কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলা সদরের ফুলসাগর সংলগ্ন চন্দ্রখানা বালাটারি গ্রামে।

তিনি ৫ ছেলে ও ১ মেয়ে সন্তানের জনক। এখানে তিনি তার স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে বসবাস করছেন। তার ৫ সন্তানের মধ্যে শাহীন নামের এক ছেলে কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার নাথের পেটুয়া বাতাসু বড়বাড়ী গ্রামে পৈত্তিক বসতবাড়িতে বসবাস করছেন।

জানা গেছে, ব্রিটিশ শাসন আমলে বাবা মাওলানা আব্দুল মজিদ আনছারীর সঙ্গে জান্নাতুল ফেরদৌস কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী, ফুলবাড়ীসহ বিভিন্ন স্থানে সফর করতেন।বাবা ধর্মীয় লাইনে শিক্ষিত হওয়ায় তিনি কুড়িগ্রামে ওয়াজ নছিয়ত করে বেড়াতেন। বাবার সফরসঙ্গী হিসেবে ছিলেন জান্নাতুল ফেরদৌস।

বাবার সঙ্গে সফরে এসে তিনি কুড়িগ্রামের মায়ায় জড়িয়ে যান। জান্নাতুল ফেরদৌস ধর্মীয় লাইনে লেখা পড়া শুরু করেন ভূরুঙ্গামারী উপজেলায়। লেখা পড়ার পর কুমিল্লা চলে গেলেও দেশ স্বাধীন হওয়ার মায়ার টানে আবারো ছুটে আসেন কুড়িগ্রামে।

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী, নাগেশ্বরী ও ফুলবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন স্থানে জান্নাতুল ফেরদৌস বাড়ি বাড়ি গিয়ে কোরআন শিক্ষা প্রদান করেন। নাগেশ্বরী উপজেলার উত্তর ব্যাপারীহাটে কোরআন শিক্ষা ও মসজিদের মুয়াজিন হিসেবে ৩০ বছর অতিবাহিত হয়।

এরপর ফুলবাড়ী উপজেলার বিদ্যাবাগীশ, কুটিচন্দ্রখানা, পানিমাছকুটি গ্রামে বাড়ি বাড়ি গিয়ে তিনি কোরআন শিক্ষা দান করেন। অসংখ্য মানুষকে কোরআন শিক্ষা দেয়ায় তিনি ফেরদৌস ওস্তাদজি হিসেবে এলাকায় সম্মানিত হন। তাকে ‘ফেরদৌস হুজুর’ হিসেবে সবাই চেনে।

বিদ্যাবাগীশ জামে মসজিদের মোয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এখানে জীবনের ৫০ টি বছর অতিবাহিত করেন। এরপর ফুলবাড়ী কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে মোয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করেন ৩ বছর। কাছারী মাঠ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে ২ বছর মোয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করেন।

সব মিলে তিনি জীবনের ৮৫ থেকে ৯০ বছর পার করেছেন মোয়াজ্জিন ও কোরআন শিক্ষার পাঠদানে। এখন বয়সের ভারে নুব্জ ‘ফেরদৌস হুজুর’ আর মোয়াজ্জিন ও কোরআন শিক্ষার পাঠদানের কাজ করতে পাচ্ছেন না।

সৈয়দ মোহাম্মদ আনছারী এখন কাজের দায়িত্ব পালন করতে না পারলেও নিজের আমলের দায়িত্ব অটুট রেখেছেন। জীবনের ১১৬ বছরের জীবনে তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, কোরআন তেলাওয়াত অব্যাহত রেখেছেন।

ফুলবাড়ী শিশু কানন বিদ্যালয়ের সহাকারী শিক্ষক আব্দুল আজিজ বাবুল জানান, ‘চন্দ্রখানা বালাটারি গ্রামের আমার সম্পর্কের ফুফুকে বিয়ে করেন সৈয়দ ফেরদৌস হুজুর।’

About admin

Check Also

চাঁদপুরে নির্মাণ হলো ‘আল্লাহর ৯৯ নামের স্তম্ভ’

চাঁদপুরের কচুয়ার কড়ইয়া ইউনিয়নে ব্যক্তি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের আর্থিক সহায়তা নির্মিত হয়েছে আল্লাহর ৯৯ নামের …

Leave a Reply

Your email address will not be published.