লাখো নারীর স্বপ্নের দিশা নাসিমা আক্তার নিশা

দেশে ফেসবুক গ্রুপগুলোর মধ্যে হালের আলোচিত নাম উইম্যান অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম (উই)। বর্তমানে নারী উদ্যোক্তাদের জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মটির সদস্য সংখ্যা সাড়ে ১২ লাখের মতো। যাদের মধ্যে রয়েছেন উদ্যোক্তা, ক্রেতা সবাই। প্ল্যাটফর্মটির কার্যক্রম এখন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে পা বাড়িয়েছে গ্লোবাল প্ল্যাটফর্মে। এই ফোরামের মাধ্যমে লাখো নারী হয়েছে স্বাবলম্বী এবং খুঁজে পেয়েছে জীবনের দিশা।

যিনি এই ডিজিটাল প্লাটফর্মটি তৈরি করেছেন, যার সাহসী ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে লাখো নারী আজ তৈরি করেছেন নিজস্ব পরিচয়, তিনি হলেন বাংলাদেশের নারী উদ্যোক্তাদের আইকন ‘উইম্যান অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম’-এর স্বপ্নদ্রষ্টা এবং প্রতিষ্ঠাতা নাসিমা আক্তার নিশা।

বর্তমানে তিনি উইয়ের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সদস্য।

শুধু একটা স্মার্টফোন বা ল্যাপটপে ইন্টারনেট প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশীয় ঐতিহ্যবাহী পণ্যের উপর নির্ভরশীলতা বাড়িয়ে কীভাবে একজন নারী সফল উদ্যোক্তা হতে পারেন, সে জাদুকরী কৌশল উদ্ভাবন করেছেন তিনি। একই সাথে সফল উদ্যোক্তা হিসেবে হাজারো তরুণের স্বপ্ন বুনেছেন তিনি। আর এভাবেই চার বছরে দেশের লাখো নারীকে স্বাবলম্বী করে তুলেছেন স্বপ্নবাজ এই উদ্যমী উদ্যোক্তা।

নিশার ছোটবেলা কেটেছে রাজধানীর বনানীতে। বাবা হাজী সাহাব উদ্দিন ছিলেন ল্যান্ড ডেভেলপার ব্যবসায়ী। মা গৃহিনী। চার ভাই ও চার বোনের মধ্যে তিনি বাবা-মায়ের আদরের ছোট মেয়ে। বাবা ছিলেন তার শিক্ষাগুরু। বাবার কাছ থেকেই পেয়েছেন জীবন চলার পথের শিক্ষা এবং নিজেকে তৈরির দিশা।

নিশা বলেন, আমার বাবা আমাকে কখনোই বনানী এলাকার বাইরে যেতে দিতো না। ছোটবেলায় খুব বেশি কথা বলতাম বলে বাবা বলতেন, তোকে আমি ল-ইয়ার বানাবো। তখন থেকেই মাথায় নিয়েছিলাম আমাকে ল-ইয়ার হতে হবে। সেভাবেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।

১৯৯৭ সালে বনানী মডেল স্কুল থেকে এসএসসি এবং আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে এইসএসসি পাস করি। যেহেতু ল-ইয়ার হবো আমাকে অন্যকিছু করার দরকার ছিল না। আমাকে স্কুলের শিক্ষকরা বলেছিলেন, ইংরেজিতে জোর দাও এবং মানবিক বিভাগে পড়ো। উনাদের কথা মতো পড়েছি।

জীবনে কখনো যে ব্যবসা করবো, সেটা চিন্তাও করিনি। কিন্তু যখন ল’-এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন দেখলাম ১৯৯৯ সালে ল’-এর জন্য বনানীর আশপাশে তেমন ভালো কলেজ নেই। সেটা করতে হলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ল’তে অনার্স করতে হবে।

বাবা তো এতদূর যেতে দেবে না। তখন শরণাপন্ন হই আমার একমাত্র কাছের মানুষ, বন্ধু ফয়সাল শিকদারের কাছে (যিনি পরে আমার জীবনসঙ্গী হন)। তিনিও এতদূর যেতে দিলেন না। পরিবেশ অনুকূলে না থাকায় ঘরের পাশে নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে যাই। পরে গ্র্যাজুয়েশনও করি একটা কলেজ থেকে।

নিশার পড়াশোনার জীবন চলতে থাকে আপন গতিতে। ২০০৩ সালে নিজের পছন্দে পারিবারিকভাবে বিয়েটা করে ফেলেন তিনি। স্বামী ফয়সাল ছিলেন পেশায় ব্যবসায়ী।নিশার ভাষ্য, পড়াশোনা করা অবস্থায় আমার বাবা অসুস্থ হয়ে যান।

তখন বাবার ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ব্যবসা দেখাশোনা শুরু করি। সময়ের অমোঘ নিয়মে বাবা চলে যান না ফেরার দেশে। বিধি বাম। সব দায়িত্ব এমনিতেই চলে আসে নিজের কাঁধে। তখন বাবার অফিসের পুরো দায়িত্ব নিতে হয় আমাকে। ফুলটাইম অফিসে দিতে হতো। এরই মধ্যে ২০১২ সালে এমবিএটা সম্পন্ন করি।

বাবা বেঁচে থাকার সময় ও স্বামী দুজনেরই ইচ্ছা ছিল আমি যাই করি না কেনো পিএইচডিটা যেন সম্পন্ন করি। সে জন্যই এমবিএতে ভর্তি হয়েছিলাম। এমবিএ করাকালীন কোল আলো করে আমাদের পরিবারে এলো ভালোবাসার ফসল। ছেলে সন্তানের মা হই আমি। ছেলের নাম রাখি আয়ান। স্বামী-সংসার, পরিবার, ব্যবসা সব সামলিয়ে অনেক কষ্টে এমবিএ করলেও পিএইচডি পর্যন্ত যেতে পারিনি।

কথায় কথায় নিশা ফিরে যান পেছনের দিনগুলোতে। তখন ২০০৬ সালের শেষের দিক। তার শরীরে দানা বাঁধে একটি জটিল রোগ, যা তাকে ভুগিয়েছিল প্রায় চার বছর। ওই সময়টাতে তিনি যৌথভাবে একটা গেমিং কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন। শরীরের অবস্থা খারাপ হলে চিকিৎসার জন্য তাকে যেতে হয় দেশের বাইরে।

চিকিৎসা শেষে ফিরে আসেন দেশে। ভাগ্য আবারো প্রসন্ন হয়নি তার। যখন ফিরে এলেন, প্রতিষ্ঠানটি নানা কারণে থেমে যায়। এসে দেখেন তার পার্টনাররা প্রতিষ্ঠানটিকে দাঁড় করাতে পারেননি। খুব কষ্ট পেয়েছিলেন সেদিন। তবে হাল ছাড়েননি। নিজের আইটি নলেজ না থাকলেও গেমিং ইন্ড্রাস্টির প্রতি প্রচ্ছন্ন একটি ভালোবাসা ছিল তার।

এরপর মাথায় ভূত চাপে নিজের গেমিং কোম্পানি দেয়ার। তখন নর্থ সাউথের বন্ধুদের সাহায্যে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘রিভারি করপোরেশন’। এর মাঝে মহাখালীতে সম্পূর্ণ নিজের তত্ত্বাবধানে একটি গার্মেন্ট ব্যবসাও শুরু করেন। সবই বেশ ভালই চলছিল

তারপর জয়েন করেন ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব) সংগঠনে। শুরু হয় নতুন ভাবে কাজ করা। সময়টা ছিল ই-কমার্সের উত্থানের। তখন তিনি ই-ক্যাবের ডিরেক্টর হিসেবে জয়েন করেন। রাজিব আহমেদ ছিলেন তখন ই-কমার্স সেক্টরকে এগিয়ে নেয়ার আন্দোলনের স্বপ্নদ্রষ্টা।

আর আব্দুল ওয়াহেদ তমাল ছিলেন সেক্রেটারি। ওনাদের সাথে দিন-রাত সময় দিয়ে ই-ক্যাব সংগঠনটাকে একটা সরকারি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানে রুপ দিতে কাজ করে যান নিশা। বিভিন্ন জটিলতার কারণে গার্মেন্টস ব্যবসাটি বন্ধ করে দেন তিনি। পুরোটা সময় দিতে থাকেন ই-ক্যাবের পেছনে।

ই-ক্যাবে সময় দিতে গিয়ে তার ভাবনায় যোগ হয় নতুন পালক। ই-ক্যাব সংগঠনটাকে বেগবান করতে প্রতিষ্ঠাতা রাজিব আহমেদের সাথে বিভিন্ন সাংগঠনিক প্রোগ্রামে অংশগ্রহণ করতে গিয়ে দেখেন দেশে অসংখ্য উৎসাহী, উদ্যমী, মেধাবি, আত্মপ্রত্যয়ী, কঠোরপরিশ্রমী নারী আছেন।

যারা নিজের যোগ্যতায় অনেক সৃজনশীল উদ্যোগ নিচ্ছেন। ই-কমার্স ব্যবসা করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। কিন্তু কোনো পরিকল্পনাই ভালভাবে এগিয়ে যেতে পারছিল না। নানান সমস্যায় পড়ছেন। ফলে অনেকে হতাশ হয়ে নতুন নতুন উদ্ভাবনী চিন্তার বাস্তবায়ন করতে পারছিলেন না।

সারাদেশের ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা এসব সৃজনশীল নারীদের নিয়ে একটা প্লাটফর্ম করার পরিকল্পনা করেন। ‘আমরা নারী, সবই পারি’ সে ভাবনা থেকেই নতুন কিছু করার স্বপ্ন বুনেন নিশা। যেই ভাবা সেই কাজ। কয়েকজন বান্ধবী মিলে একটা গ্রুপ খুলেন। নাম দেন ‘উইম্যান অ্যান্ড ই-কমার্স ফোরাম (উই)’। ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর এ গ্রুপের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।

নিশা বলেন, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য একটা অত্যাধুনিক ভার্চুয়াল প্লাটফর্ম করার চিন্তা মাথায় আগে থেকেই ছিল। যেখানে সারাদেশের নারীরা তাদের উদ্ভাবনী চিন্তা-ভাবনা, উদ্যোগ, কাজের অভিজ্ঞতা অকপটে শেয়ার করতে পারবেন। নিজেদের মধ্যে একটা শক্তিশালী নেটওয়ার্কিং হবে। পুরো বাংলাদেশের নারীরা হবে একটা নতুন জাগরণের দিশা।

সে লক্ষ্যকে সামনে নিয়ে ধীরে ধীরে পরিকল্পনা করে এগিয়ে যেতে থাকেন স্বপ্নবাজ এই উদ্যোক্তা। ২০১৮ সালে বান্ধবীদের সাথে এই যাত্রায় সারথি হিসেবে পান ই-ক্যাবের স্বপ্নদ্রষ্টা রাজিব আহমেদকে। তিনি উইয়ের উপদেষ্টা হিসেবে ফোরামটাকে একটা শক্ত প্লাটফর্মের উপর দাঁড় করাতে নিত্যনতুন স্ট্র্যাটেজি প্ল্যান করতে শুরু করেন। ছোট শিশুর মতো ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে নিশার স্বপ্নের ফোরাম ‘উই’। সদস্য সংখ্যা হো হো করে বাড়তে থাকে। শত থেকে হাজার। হাজার থেকে লাখ। তখন চিন্তা করেন বিজনেস মডেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সেই সাথে এটিকে রেজিস্টার্ড ট্রাস্ট করে ফেলেন।

নিশা বলেন, আমার সন্তানতুল্য উদ্যোগ উই শুধু একটি ফেসবুক গ্রুপ নয়। সুবিশাল একটা নেটওয়ার্কিং প্লাটফর্ম। পাশাপাশি এটি একটি রেজিস্টার্ড ট্রাস্টও গঠন করেছি। যখন কোনো ব্যবসায়িক উদ্যোগ নিই, তখনই পদে পদে বাধার মুখে পড়েছি। সেই সবের সমাধানই ‘উই’। মজার বিষয় হচ্ছে এখানে ক্রেতা ও বিক্রেতা দুই ধরনের নারীই আছেন। দেখা যাচ্ছে যিনি বিক্রি করছেন আবার তিনিই অন্য কিছু কিনছেন। দেশের বাইরের অনেকে এখন আমাদের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।

২০১৯ সালের নভেম্বর। সারাদেশে তখনো করোনার প্রভাব চলছে। নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়ন নিয়ে যখন তিনি অনেক ব্যস্ত সময় পার করছেন, তখন হঠাৎ করে তার জীবনে নেমে আসে কাল বৈশাখীর ঝড়। এক ঝাপটায় লণ্ডভণ্ড করে দিয়ে যায় তার সবকিছু। কেড়ে নেয় জীবনের সবচেয়ে দামি উপহার এবং সবকিছুর মূলশক্তি জীবনসঙ্গীকে। অকালে স্বামী হারান নিশা। প্রিয়জন হারানোর ব্যথায় অনেকটা দিশেহারা নাবিকের মতো অবস্থা তার। এ অবস্থায় কেটে যায় তার বেশি কিছু দিন। মনকে শক্ত করেন আত্মপ্রত্যয়ী এই যোদ্ধা। প্রতিজ্ঞা করেন নতুন উদ্যমে এগিয়ে যাবার। আবারো ঘুরে দাঁড়ান নিশা। শোককে শক্তিতে পরিণত করে পুরোদমে কাজে ফেরেন তিনি। নতুন রূপে জীবন শুরু হয় তার।

নিশার ভাষ্য, ‘উই’ শুরুর পর নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। আমার ভেতরে যথেষ্ট ধৈর্য শক্তি ছিল। ধৈর্য ধরে টিকে ছিলাম বলে আজকে আমার ‘উই’ এখানে আসতে পেরেছে। পরিকল্পনা করে দেশের ৬৪ জেলায় ছুটে গিয়েছি। আমাদের দেশের তাঁতপণ্য হারিয়েই যেতে বসেছিল। শীতলপাটিও হারিয়ে যেতে বসেছিল, কিন্তু উইয়ের উদ্যোগ শুরুর পর তাঁতীরা এখন অবসরই পাচ্ছেন না। এমনকি তারা কাজও ফিরিয়ে দিচ্ছেন। এমন অসংখ্য দেশীয় ঐতিহ্য নিয়ে কাজ করছে নারী উদ্যোক্তারা। সব ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনছে তারা।

বর্তমানে উইয়ের ফেসবুক গ্রুপে সাড়ে ১২ লাখের মতো সদস্য রয়েছেন। উইয়ের উদ্যোক্তাদের বেশিরভাগ পার্সোনাল ব্র্যান্ডিংকে গুরুত্ব দেন। কারণ এ গ্রুপে সেল পোস্ট করা নিষেধ। নিজের পণ্যের এবং নিজের পরিচিতি দিয়ে পোস্ট করাটাই এখানকার মূল বৈশিষ্ট্য। গ্রুপের রুলস অনুযায়ী পোস্ট করলে সবার পোস্টই অ্যাপ্রুভ হয় এখানে। উই থেকে কেনাবেচা হলে কাউকে কোনো কমিশনও দিতে হয় না। উইয়ের অ্যাডমিন বা মডারেটররা কোনো উপহার নিতে পারেন না সদস্যদের কাছ থেকে। এরকম অনেক সুন্দর সব নিয়মের কারণে প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীদের প্রিয় প্লাটফর্ম এখন উই।

গ্রুপটিতে ৩৫ জনের মতো মডারেটর আছেন। তবে ২৪ ঘণ্টায় সিডিউল করে তারা কাজ করে থাকেন। মডারেটররাও একেকজন উদ্যোক্তা। তাদের নিজেদের কাজেও সময় দিতে হয়। এটা মূলত ভলান্টারি কাজ। এখান থেকে কেউ কোনো আর্থিক সুবিধা পান না। তবে এখান থেকে তারা ব্র্যান্ডিং ও পরিচিতিটা পাচ্ছেন। তাদের পণ্যকে সহজে সবাই চিনতে পারছে।

নিশা বলেন, উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বাড়ানোর দিকে আমরা সবসময় লক্ষ রাখি। দক্ষতা উন্নয়নের জন্য তাদের শতভাগ সাপোর্ট দিই। নানা ধরনের স্কিল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম করি। করোনার সময়েও নারীরা বাসায় বসে যেনো অলস সময় না কাটান, বরং কোন বিষয়ে দক্ষ হতে পারেন সেজন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। বিভিন্ন ট্রেনিং, ওয়ার্কশপের মাধ্যমে তাদের সম্ভাবনাগুলোকে যেন বের করে নিয়ে আসতে পারি, সেজন্য কাজ করছি। অনেক নারী জানতেন না কিভাবে একটা উদ্যোগ নিতে হয়। তারা এখন জানেন। ট্রেড লাইসেন্স ছাড়াও আরো অনেক কিছুর দরকার হয়। সেসবও জানা হয়েছে অনেকের। ব্র্যান্ডিংয়ের জন্য কী কী করতে হয় তা নিয়েও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। আমরা প্রতিনিয়ত শেখানোর চেষ্টা করছি।

নারীদের দক্ষতা বাড়াতে পরিকল্পনা করে উই থেকে অফলাইন-অনলাইনে ট্রেনিং ও ওয়ার্কশপের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। আইসিটি মিনিস্ট্রির সহায়তায় কোর্সেরা ও মাস্টারক্লাস নামে ইন্টারন্যাশনাল মানের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। এখনো চলছে। এছাড়াও গ্রুপের সদস্যদের শেখার আগ্রহ থেকে এখানে ফ্রিতে প্রশিক্ষণের সুযোগও রয়েছে। পাশাপাশি বেকিং, কুকিং, ফটোগ্রাফি ফ্যাশন ডিজাইনিং নিয়েও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। ২০১৭ সাল থেকেই প্রতি মাসেই উই থেকে কোনো না কোনো ট্রেনিংয়ের আয়োজন করা হয়ে আসছে। তাছাড়া উদ্যোক্তাদের জন্য নানা ধরনের সেমিনার বা মেলার আয়োজন করা হয়েছে।

নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাজের অভিজ্ঞতা বলতে গিয়ে নিশা বলেন, আমি যখন আইটি ইন্ডাস্ট্রিতে আসি, আমার পড়াশোনা কিন্তু আইটিতে ছিল না। আমি ঠোকর খেয়ে খেয়ে বা সমস্যায় পড়ে পড়ে শিখেছি। তখন আমার মনে হতো বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসগুলো যদি আরো ভালোভাবে করতাম, তাহলে আজ ঠেকতে হতো না। কারণ, ৬ ক্রেডিটের আইটিতে তখন পাস করার জন্য পড়তাম।

যেকোন উদ্যোগ বাস্তবায়নে পদে পদে নানান প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। নিশাও এর ব্যতিক্রম হননি। নিশার ভাষ্য, স্বপ্নের উদ্যোগ বাস্তবায়নে অনেক প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়েছি। যখন থেকে আমি শুরু করেছি, মানে যখন আমি একেবারে নতুন ছিলাম, যখন শেখা শুরু করেছি, কিভাবে কাজ করতে হবে, কিভাবে ক্লায়েন্ট পেতে হয়, অনেক শেখার পরও অনেক জটিলতার মুখোমুখি হয়েছি বারবার আমি হোঁচট খেয়ে ফিরে এসেছি। যেমন ধরেন, আমি নিজে কোনো একটা প্রজেক্ট রেডি করেছি মিনিস্ট্রির জন্য কিন্তু সেই প্রজেক্টটা আর আমার কাছে আসেনি। আমি আসলে জানতাম না যে, কিভাবে আইডিয়া সাবমিট করতে হয়। আমি আমার মতো আইডিয়া সাবমিট করেছি কিন্তু কিছুদিন পরে দেখা গেলো সেই আইডিয়া অন্যজন নিয়ে কিছু কাজ করে ফেলেছে। এই জিনিসগুলো নিয়ে আমি খুবই সমস্যায় পড়তাম। মাঝখানে ভেবেছি আর কাজই করবো না। কিন্তু তবুও করেছি। কি করবো, ছাড়িনি কখনো। ধৈর্য নিয়ে এগিয়ে গিয়েছি। তাই আজ এখানে আসতে পেরেছি।

উইয়ের সফলতার পেছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি। যার কথা উইবাসীদের কাছে মন্ত্রের মতো তিনি হলে ই-ক্যাবে প্রেসিডেন্ট রাজিব আহমেদ। নিশা বলেন, উইকে সফল করতে ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত রাজিব আহমেদ স্যার আমাদের সাথে ছিলেন উপদেষ্টা হিসেবে। তিনি তখন ই-ক্যাবের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। যেহেতু আমি ই-ক্যাবের ডিরেক্টর ছিলাম, একটা অ্যাসোসিয়েশনে থেকে একটা সংগঠন করা খুব সহজ ছিল না। ওই সময়ে রাজিব আহমেদ স্যার প্রেসিডেন্ট থাকায় তিনিই আমাকে অনুমতি দিয়েছিলেন। তখন আমার মনে হলো এবার আমি আমার স্বপ্নকে পূরণ করতে পারবো। রাজিব স্যার এই স্বপ্ন পূরণে অনেক সাহায্য করেছেন। তাই স্যারের প্রতি রইল আমার বিনম্র শ্রদ্ধা এবং কৃতজ্ঞতা।

এছাড়াও আরো কয়েকজন বন্ধবীদের প্রতি আমি কৃতজ্ঞ যাদের সাহায্য ছাড়া আমি এই উদ্যোগ সফল করতে পারতাম না। এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে তাদের জানাই কৃতজ্ঞতাপূর্ণ ধন্যবাদ। পাশাপাশি আমাদের সব উপদেষ্টার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ। বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই আরিফুল হাসান অপু, কবির সাকিব এবং সৌম বসুকে। সবারই সক্রিয় ভূমিকা ছিল উইকে সামনে নিয়ে আসার জন্য। আমাদের আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক ও হাইটেক পার্কের এমডি হোসনে আরা বেগম যথেষ্ট সহায়তা করেছেন প্ল্যাটফর্মটিকে সামনে নিয়ে আসার জন্য। সবার প্রতি রইল কৃতজ্ঞতা অশেষ।

নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য নিশা বলেন, আপনারা অবশ্যই সৎ থাকবেন। সৎভাবে নিজের উদ্যোগকে সামনে নিয়ে যাবেন। পাশাপাশি ধৈর্য ধরবেন। আমাদের ভেতরে ধৈর্যের অনেক অভাব। আজকে যদি আমাদের ব্যবসায় লোকসান হয়, কালকেই আমাদের উদ্যোগ বন্ধ করে দেই। এটা করা যাবে না। সততা ও ধৈর্যের মাধ্যমেই আমাদের সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

উইকে নিয়ে নিশার পরিকল্পনা অনেক বড় ও সুদূর প্রসারী। তিনি বলেন, এখন উইয়ের উদ্যোক্তাদের দেশী পণ্য দেশের বাইরে যাচ্ছে নিয়মিত। রফতানিতেও কাজ করে যাচ্ছে উই। সফলতাও আসতে শুরু করেছে। দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও ডানা মেলেছে উই। আমাদের উদ্যোক্তারা গুণগত মানসম্পন্ন দেশীয় পণ্য তৈরি করেন। তাদের পণ্য বিশ্বমানের। এই পণ্যগুলোকে উইয়ের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে দিতে চাই। সে পরিকল্পনা চলছে। আমরা বায়ারদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমাদের পণ্যগুলো পাঠাবো। যেখানে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ বাই উই’ এমন ট্যাগলাইন থাকবে। এখন জাপান ও মালয়েশিয়া উইয়ের চ্যাপ্টার খোলা হয়েছে। ২০২২ সালে সাউথ এশিয়ার দিকে যাবো। এরপর এশিয়ার বাইরে। আমরা ধীরেসুস্থে এগিয়ে যেতে চাই। দেশের ই-কমার্স ব্যবসায়ীদের জীবনমান উন্নয়নে সারাজীবন কাজ করতে চাই। এর জন্য সবার দোয়া কামনা করছি।

About admin

Check Also

বাংলাদেশে নিরাপদ সড়কের দাবিতে শ্রাবন্তী

প্রতিদিন সড়কে ঝরে যাচ্ছে একাধিক প্রাণ। এ নিয়ে বিভিন্ন সময় বিক্ষোভ হলেও সময় গড়াতেই এসব …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *